উপনিষদ হলো বেদান্ত বা বেদের শেষ ভাগ, যেখানে বৈদিক ঋষিদের গভীরতম আধ্যাত্মিক দর্শন ও ব্রহ্মজ্ঞানের কথা বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বপ্রাচীন এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ঈশ উপনিষদ’ (Isha Upanishad)। শুক্ল যজুর্বেদের অন্তর্গত এই উপনিষদটি আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র—এতে মাত্র ১৮টি মন্ত্র রয়েছে। কিন্তু এর প্রথম মন্ত্রেই ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ এবং জগতের সাথে তাঁর সম্পর্কের যে গভীর দর্শন তুলে ধরা হয়েছে, তা সমগ্র সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি।
আসুন, ঈশ উপনিষদের আলোকে ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ এবং তাঁর সর্বব্যাপী সত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করি।
ঈশ উপনিষদের প্রথম মন্ত্র: ঈশ্বরের সর্বব্যাপী স্বরূপ
ঈশ উপনিষদের শুরুতেই বলা হয়েছে যে, এই জগত শূন্য নয় বা এটি অন্ধ প্রকৃতির কোনো খেলা নয়; বরং এর প্রতিটি অণু-পরমাণুতে ঈশ্বর ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন।
तेन त्यक्तेन भुञ्जीथा मा गृधः कस्यस्विद्धनम् ॥१॥
ব্যাখ্যা: এই মন্ত্রটিতে পরমাত্মার বা ঈশ্বরের সর্বব্যাপী (Omnipresent) রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ঈশ্বর কোনো দূর আকাশের সিংহাসনে বসে থাকা কোনো সত্তা নন; তিনি এই জগতের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি জীবের অন্তরে এবং বাইরে বিরাজমান। যেহেতু সবকিছুই তাঁর, তাই উপনিষদ আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে এই জগতকে ভোগের বস্তুর বদলে ত্যাগের দৃষ্টিতে দেখতে।
পরমাত্মার বৈপরীত্যময় স্বরূপ: তিনি চলেন, আবার চলেন না
ঈশ্বর বা ব্রহ্মের স্বরূপ মানুষের সাধারণ বুদ্ধির অতীত। তিনি সগুণ আবার নির্গুণ, তিনি নিরাকার আবার সাকার। ঈশ উপনিষদের পঞ্চম মন্ত্রে ঈশ্বরের এই মনস্তাত্ত্বিক ও বৈপরীত্যময় স্বরূপের অত্যন্ত সুন্দর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
तदन्तरस्य सर्वस्य तदु सर्वस्यास्य बाह्यतः ॥५॥
সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মের মিলন
আপাতদৃষ্টিতে এই কথাগুলো সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। কীভাবে কেউ চলতে পারে আবার স্থির থাকতে পারে? এর আধ্যাত্মিক অর্থ হলো, যখন আমরা ব্রহ্মকে নির্গুণ নিরাকার রূপে দেখি, তখন তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে, অসীম ও অপরিবর্তনীয় (তাই তিনি চলেন না)। কিন্তু যখন তিনি মায়ার মাধ্যমে এই জগত সৃষ্টি করে সগুণ বা সাকার রূপ ধারণ করেন, তখন তাঁর লীলা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল (তাই তিনি চলেন)।
অজ্ঞানী ব্যক্তির কাছে ঈশ্বর কোটি কোটি যোজন দূরে অবস্থান করেন, কিন্তু একজন জ্ঞানীর কাছে ঈশ্বর তাঁর নিজের অন্তরের চেয়েও নিকটে অবস্থান করেন।
সর্বভূতে ঈশ্বর দর্শন: মুক্তির চরম সোপান
ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ যিনি উপলব্ধি করেছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হয়? ঈশ উপনিষদের ষষ্ঠ ও সপ্তম মন্ত্রে এর উত্তর দেওয়া হয়েছে।
सर्वभूतेषु चात्मानं ततो न विजुगुप्सते ॥६॥
যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, আমার ভেতরের আত্মা এবং সৃষ্টির অন্য সব কিছুর ভেতরের আত্মা এক এবং অভিন্ন—আর সেই পরমাত্মাই হলেন ঈশ্বর, তখন আমাদের মন থেকে সকল প্রকার অহংকার, ঘৃণা ও বিদ্বেষ মুছে যায়।
"যেখানে ঈশ্বর ব্যতিত আর কোনো দ্বিতীয় সত্তা নেই, সেখানে শোক কোথায়? মোহ কোথায়? যিনি একত্ব দর্শন করেছেন, তাঁর কাছে ভেদাভেদ বলে কিছু থাকে না। এটাই হলো অদ্বৈত বেদান্তের চরম সত্য।"
উপসংহার
ঈশ উপনিষদ আমাদের অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান দেয়। ঈশ্বর কোনো বিশেষ স্থান, মন্দির, বা মূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ হলো তিনি সত্যম, জ্ঞানম, অনন্তম (অসীম সত্য ও জ্ঞান)। এই জগত তাঁরই প্রকাশ। তাই সমস্ত জীবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করাই হলো আধ্যাত্মিক জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
মতামত দিন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন