অথর্ববেদ বাংলা ভাষ্য
বিশুদ্ধ অথর্ববেদের বাংলা অনুবাদ
অথর্ববেদ - কাণ্ড ১, সূক্ত ১, মন্ত্র ১
য়ে ত্রীষপ্তাঃ পরিয়ন্তি বিশ্বা রূপাণি বিভ্রতঃ। বাচস্পতির্বলা তেষাং তন্বো অদ্য দধাতু মে।।
যে। ত্রী। সপ্তাঃ। পরি-যন্তি। বিশ্বা। রূপাণি। বিভ্রতঃ। বাচঃ। পতিঃ। বলা। তেষাম্। তন্বঃ। অদ্য। দধাতু। মে।।
বেদ পরিচিতি
বেদ কী এবং এর উৎস কী?
বেদ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘বিদ্’ ধাতু (যার অর্থ ‘জ্ঞান’) এবং ‘ঘঞ্’ প্রত্যয় (যা ‘ক্রিয়া’ বোঝায়) থেকে হয়েছে। বেদ চারটি — ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, এবং অথর্ববেদ। সনাতন বিশ্বাস অনুসারে, এই চারটি বেদ মানব সভ্যতার শুরুতে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা—এই চার ধ্যানমগ্ন ঋষির অন্তরে প্রকাশিত হয়েছিল।
বেদের অর্থ, ভাষা ও বিষয়বস্তু
বেদ মন্ত্রের তিন প্রকার অর্থ হতে পারে: যাজ্ঞিক/আধিভৌতিক (বিজ্ঞান বা ক্রিয়াকলাপ ভিত্তিক), আধিদৈবিক (দেবতার মহত্ত্বের প্রশংসা) এবং আধ্যাত্মিক (আত্মা ও পরমাত্মা সম্পর্কিত জ্ঞান)। বেদে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ইতিহাস বা বিশেষ স্থানের ভূগোল নেই। ইতিহাস এবং ভূগোলের অনেক নাম বেদের শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, এর বিপরীতটা সত্যি নয়।
যজুর্বেদের ৩৬.১ অংশে চারটি বেদের প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে কাব্যিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়: ঋগ্বেদ জ্ঞান এবং বাণীর প্রচার করে। যজুর্বেদ মনকে বিকশিত করে, যা সমস্ত কাজের উৎস। সামবেদ জীবনশক্তি এবং লক্ষ্যকে বিকশিত করে। অথর্ববেদ স্বয়ং, শরীর এবং ইন্দ্রিয় যেমন চোখ ও কানকে পূর্ণতা প্রদান করে।
বেদ ‘বৈদিক সংস্কৃত’ ভাষায় রচিত। এই ভাষায় প্রতিটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকতে পারে এবং প্রতিটি বস্তুর জন্য একাধিক শব্দ ব্যবহার হতে পারে। সাধারণ সংস্কৃতের বিপরীতে, বৈদিক সংস্কৃতে শব্দের উপর ‘স্বর চিহ্ন’ (উচ্চারণ চিহ্ন) ব্যবহার করা হয়, যা তাদের অর্থকে প্রভাবিত করে। বেদ সঠিকভাবে বোঝার জন্য ছয়টি বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করা অপরিহার্য: (১) শিক্ষা, (২) কল্প, (৩) ব্যাকরণ, (৪) নিরুক্ত, (৫) ছন্দ, এবং (৬) জ্যোতিষ।
বেদের সংকলন ও পারিভাষিক শব্দ
বেদ মন্ত্রগুলিকে মণ্ডল, সূক্ত, অষ্টক, অধ্যায় ইত্যাদিতে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে এবং প্রতিটি বেদ মন্ত্রের সঙ্গে তাদের ঋষি, দেবতা, ছন্দ ইত্যাদির সংকলনকে ‘বেদ সংহিতা’ বলা হয়। যুগে যুগে এক বা একাধিক বেদ মন্ত্রের সঠিক অর্থ থেকে জ্ঞান লাভকারী ব্যক্তিরা ‘ঋষি’ নামে পরিচিত। প্রতিটি বেদ মন্ত্র পরম সত্তা এক ঈশ্বরের এক বা একাধিক গুণের স্তুতি করে। এই ধরনের প্রতিটি ঐশ্বরিক গুণকে স্বতন্ত্রভাবে ‘দেবতা’ বলা হয়। প্রতিটি মন্ত্র নির্দিষ্ট কাব্যিক ছন্দে (ছন্দ) এবং সাতটি সঙ্গীতের স্বরের (স্বর) একটিতে গাওয়া হয়। প্রাচীনকালে বিভিন্ন ঋষিরা বেদের সংকলন করেছিলেন, যা ‘শাখা’ বা ‘সংহিতা’ নামে পরিচিত, যেমন—শৌনক শাখা/সংহিতা।
“বেদ সকল সত্য বিদ্যার পুস্তক। বেদ পড়া ও পড়ানো, শোনা ও শোনানো সকল আর্যের (ধার্মিক ব্যক্তির) পরম কর্তব্য।”
(আর্য সমাজের দ্বিতীয় নিয়ম)
অথর্ববেদ পরিচিতি
তাৎপর্য ও বিষয়বস্তু
অথর্ববেদ হলো ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ লাভের উপায়গুলির চাবিকাঠি। জীবন একটি নিরন্তর সংগ্রাম এবং অথর্ববেদ এই জীবন-সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের উপায় বলে দেয়। এটি যুদ্ধ এবং শান্তির বেদ। শরীরে, পরিবারে, রাষ্ট্রে এবং বিশ্বে কীভাবে শান্তি বজায় থাকবে, তার জন্য এতে নানা প্রকারের ঔষধ এবং দিব্য বিধান রয়েছে। যদি কোনো দেশ শান্তি ভঙ্গ করতে চায়, তাহলে তার সঙ্গে কীভাবে যুদ্ধ করতে হবে, শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করতে হবে এবং তাদের কুচক্র কীভাবে সমাপ্ত করতে হবে—ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা অথর্ববেদে রয়েছে।
গঠন ও অন্যান্য নাম
চারটি বেদের ক্রমে অথর্ববেদ সর্বশেষ। 'থর্ব' ধাতুর অর্থ হলো ‘চলা বা বিচলিত হওয়া’, এর নঞর্থক রূপ 'অথর্ব'-এর অর্থ ‘অবিচল থাকা’। সুতরাং, অবিচল পরমাত্মার অবিনশ্বর জ্ঞানই হলো অথর্ববেদ। এর অন্য নামগুলি হলো ছন্দ বেদ (আনন্দের প্রতীক), অথর্বাঙ্গিরস (অঙ্গিরা ঋষি প্রাপ্ত করায়) এবং ব্রহ্মবেদ (ব্রহ্মের আলোচনা থাকায়)। অথর্ববেদে ২০টি কাণ্ড, ৭৩১টি সূক্ত এবং ৫৯৭৭টি মন্ত্র রয়েছে।
মতামত দিন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন